
শেষ পর্যন্ত হার দিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের এশিয়ান কাপ বাছাই অভিযান। শেষের আগে অবশ্য তারা লড়াইটা করেছে মনে রাখার মতো। বিশেষ করে শেষ দিকে আক্রমণের ঝড় তুলেছিল তারা। তবে সিঙ্গাপুরকে তাদের আঙিনায় হারানোর লক্ষ্যটা পূরণ হলো না। উল্টো রক্ষণের ভুলে ১-০ গোলের হার বরণ করতে হয়েছে হামজা চৌধুরীদের। প্রথমার্ধে জয়সূচক গোলটি করেন হ্যারিস স্টুয়ার্ট। শেষ দিকে বাংলাদেশের ম্যাচে ফেরা হয়নি ভাগ্য বিড়ম্বনায়। হামজার ক্রসে দারুণ বদলি মিরাজুল ইসলামের দারুণ প্রচেষ্টা থমকে যায় গোল ফ্রেমে। শেষটা হলো না মনের মতো। তবে ছয় ম্যাচে এক জয় ও দুই হারে চার দলের গ্রুপে তৃতীয় হওয়ার একটা সাফল্য সঙ্গী হয়েছে হাভিয়ের কাবরেরার দলের। বাছাইয়ে খেলা ছয় ম্যাচের একটিতেও অসহায় আত্মসমর্পণ করতে না হওয়ার কৃতিত্বটাও পাবেন ফুটবলাররা।
তবে খুব কাছে গিয়েও বারবার হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ার দায় আছে। যার বেশিটাই বর্তাবে কোচ কাবরেরার ওপর। দল, একাদশ নির্বাচনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভজঘট পাকিয়েছেন এই স্প্যানিশ। পরিস্থিতি বুঝে খেলোয়াড় পরিবর্তনে মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেননি, নিতে পারেননি সঠিক কৌশল। পজিশন বদলে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে নাড়া দেওয়ার দায়ও নিতে হবে কোচকে। তাই বাংলাদেশের ডাগআউটে কাবরেরাকে দেখতে না চাওয়ার লোকের সংখ্যাই এখন বেশি। এপ্রিলে তার সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের চুক্তি শেষ হবে। হামজা, শমিত সোমদের জন্য এখন একজন সঠিক কোচ বেছে নেওয়ার চ্যালেঞ্জটা বাফুফের। আর যদি এত কিছুর পরেও কাবরেরার চুক্তি বাড়ানো হয়, তার হবে বাফুফের কর্তাদের বড় ব্যর্থতা।
আগের দুই অ্যাওয়ে ম্যাচে ড্র করে প্রশংসা কুড়িয়েছিল বাংলাদেশ। বাছাই অভিযানের শুরুটা ভারতের মাটিতে রুখে দিয়ে। সেই ম্যাচেই অভিষেক হয়েছিল হামজা চৌধুরীর। ঘরের মাঠে সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের কাছে জোড়া হারের পর হংকং গিয়ে স্বাগতিকদের কাছ থেকে পয়েন্ট নিয়ে আসে বাংলাদেশ। নভেম্বরে শেখ মোরসালিন ও রাকিব হোসেনের জাদুতে দীর্ঘদিন পর ভারতকে হারায় তারা। সেই জয়ের ধারাটা অব্যাহত রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। বাছাইয়ে টানা দুই জয়ের কীর্তি গড়ার সুযোগটাও তারা কাজে লাগাতে পারল না। তাই হতাশা সঙ্গী করেই গ্যালারিতে আসা ছয় হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিকে ফিরতে হয়েছে।
দুটি পরিবর্তন নিয়ে সিঙ্গাপুর ম্যাচের একাদশ সাজিয়েছিলেন কাবরেরা। ভিয়েতনামের কাছে ৩-০ হারা ম্যাচে পোস্ট সামলানো মেহেদী হাসান শ্রাবণের জায়গায় ফেরানো হয় মিতুল মারমাকে। আর ফরোয়ার্ড মিরাজুল ইসলামের জায়গায় আসেন শেখ মোরসালিন। শুরু থেকেই দুই দল প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করলেও এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। সপ্তম মিনিটে ডান দিক থেকে ফাহামিদুলের বাড়ানো ক্রস ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের কাছে পৌঁছানোর আগেই ক্লিয়ার করেন হ্যারিস স্টুয়ার্ট। ১৫তম মিনিটে সাদউদ্দিনের ক্রসে শমিত সোমের হেড পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে যায়। পাঁচ মিনিট পর সিঙ্গাপুরকে হতাশ করেন মিতুল। ইসখান ফান্দির জোরালো শট লাইন থেকে আটকে দেন বাংলাদেশ কিপার। একটু পর রিহান স্টুয়ার্টের প্রচেষ্টা রুখে দেন তিনি। ২৪ মিনিটে জামাল ভুঁইয়ার অনুপস্থিতিতে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া সোহেল রানার দূর থেকে নেওয়া শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে যায়।
৩০ মিনিটে ভালো একটা সুযোগ নষ্ট করেন ফয়সাল আহমেদ ফাহিম। পজিশন বদলে তাকে খেলানো হয়েছিল মাঝামাঝি। ফাহামিদুলের আড়াআড়ি পাস পেয়েছিলেন ভালো জায়গায়। মোরসালিন ছিলেন ফাঁকায়। তবে তাকে বল না বাড়িয়ে ফাহিম এলোমেলো শটে সুযোগ নষ্ট করেন। এর এক মিনিট পর প্রতি আক্রমণে বাংলাদেশের হৃদয় ভেঙে দেয় সিঙ্গাপুর। মাঝমাঠ থেকে আসা ক্রস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গ্লেইন কিউই বাঁদিক দিয়ে বক্সে ঢুকে জোরালো শট নিয়েছিলেন। মিতুল তা ফেরালেও পুরোপুরি বিপদমুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের মার্কাররা সঠিক পজিশনে না থাকায় বল পেয়ে যান ইখসান ফান্দি। আলতো টোকায় তিনি পাস বাড়ান হ্যারিসকে। কোনাকুনি শটে এই মিডফিল্ডার পেয়ে যান পোস্টের দেখা।
৩৯ মিনিটে ম্যাচে ফেরার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। মোরসালিনের শট সাফওয়ান বাহার উদ্দিন ব্লক করার পর সুযোগ আসে ফাহিমের সামনে। তবে শট নেওয়ার আগে উঠে দাঁড়ানো বাহার উদ্দিনের গায়ে লেগে পড়ে যান। বাংলাদেশ পেনাল্টির আবেদন করলেও সাড়া দেননি অস্ট্রেলিয়ান রেফারি।
দ্বিতীয়ার্ধেও খেলা এগুতে থাকে একই ধারায়। এই অর্ধে কয়েকটি পরিবর্তনে ম্যাচের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়েছেন কাবরেরা। শাহরিয়ার ইমন, বিশ্বনাথ ঘোষ, মিরাজুল ইসলাম, কাজেম শাহরা এসে আক্রমণের গতি বাড়িয়েছেন। হামজা, শমিতরাও সেরাটা দিয়েছেন। তবে গোলের দরজাটাই খোলা যায়নি। ৭৬ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে সাদউদ্দিনের পাস ধরে বিশ্বনাথের আড়াআড়ি ক্রসে হামজার শট দূরের পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়। ৭৯ মিনিটে বাংলাদেশের সেরা প্রচেষ্টা আটকে দেয় গোল পোস্ট। হামজার লো-ক্রসে মিরাজুলের প্লেসিং সাইড পোস্টে বাধা পেয়ে ফিরলে হতাশ হতে হয়। ৮২ মিনিটে বিশ্বনাথের লং থ্রো-ইন হামজা ব্যাক হেড করে দেন গোলমুখে। তবে সাদউদ্দিন আর শমিত সোম শট নিতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে সুযোগ নষ্ট করেন।
সি গ্রুপের অপর ম্যাচে ভারত নিজেদের মাঠে হংকংকে হারিয়েছে। তবে বাংলাদেশের কাছে হারে ভারতীয়দের শেষ করতে হয়েছে তলানিতে। তিনে শেষ করাই বাংলাদেশের জন্য বড় সান্ত্বনা। ম্যাচ হারলেও এটাকেই এই বাছাইয়ের সেরা পারফরম্যান্স দাবি করেছেন কাবরেরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ র্যাংকিংয়ে ব্যাপক উন্নতি করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।